মূল্যবৃদ্ধি ও সৃজনশীলতায় ঘাটতি

সংকুচিত হতে যাচ্ছে বিলাসবহুল পণ্যের বাজার

ব্যক্তিগত বিলাসপণ্যের বৈশ্বিক বাজার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকুচিত হতে চলেছে।

ব্যক্তিগত বিলাসপণ্যের বৈশ্বিক বাজার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকুচিত হতে চলেছে। বেইন অ্যান্ড কোম্পানির সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী নামি ব্র্যান্ডগুলোর পণ্যমূল্য অযৌক্তিক বৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার ঘাটতিতে উচ্চবিত্ত ক্রেতারা অনেকটাই বিরক্ত। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতার কারণে তাদের আস্থায়ও বড় ধাক্কা লেগেছে। খবর এপি।

ইতালির বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদকদের সংগঠন আলতাগামার অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে বেইন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত বছর উচ্চমানের পোশাক, জুতা ও হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি বাবদ কোম্পানিগুলো আয় করেছে ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো। চলতি বছর আয় ২ শতাংশ কমে ৩৫ হাজার ৮০০ কোটি ইউরোয় ঠেকতে পারে। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এটাই হবে খাতটিতে প্রথম টানা দুই বছরের মন্দা।

বেইনের সিনিয়র পার্টনার ও গবেষণা–সহলেখক ক্লডিয়া ডি’আরপিজিও বলছেন, ‘এটি কোনো বিপর্যয় নয়। তবে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মানুষ সহজলভ্য ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছে। এর কারণ তাদের অর্থ নেই বলে নয়, বরং এখন তারা মূল্য ও নীতির সমন্বয় খুঁজছে।’

কভিড মহামারীর পর ২০২৩ সালে বাজার পুনরুদ্ধারকালে বিলাসপণ্যের বিক্রি বেড়ে ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি ইউরোয় পৌঁছেছিল। অবশ্য একে বেইনের বিশ্লেষকরা স্বাভাবিক মনে করছেন না। তারা একে ‘অস্থায়ী বুদ্বুদ’ অভিহিত করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রি কিছুটা কমলেও ২০১৯ সালের তুলনায় বিলাসপণ্যের বাজার এখনো প্রায় ২৫ শতাংশ বড়। অর্থাৎ লকডাউনের ধাক্কায় বিক্রি কমে যাওয়ার আগের অবস্থাকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে।

আগামী বছর বাজার ৩-৫ শতাংশ পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে। বেইনের পূর্বাভাস অনুযায়ী বিক্রি ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি ইউরোয় পৌঁছতে পারে, পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে মার্কিন আর্থিক বাজারের শক্তিশালী সম্প্রসারণ ও চীনের পুনরুদ্ধারের ওপর।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্কিন বিলাসপণ্যের বাজার চলতি বছর প্রায় ১০ হাজার ১০০ কোটি ইউরোর সমপরিমাণে স্থিতিশীল থাকবে। তবে ইউরোপের বাজার সংকুচিত হয়ে ১০ হাজার ৮০০ কোটি ইউরোয় নামতে পারে। আর চীন ও জাপানের বাজার ৮ শতাংশ পর্যন্ত পতন হয়ে যথাক্রমে ৪ হাজার ২০০ কোটি ও ৩ হাজার ১০০ কোটি ইউরোর সমপরিমাণে ঠেকতে পারে। একমাত্র ঊর্ধ্বমুখী বাজার মধ্যপ্রাচ্য। দুবাইয়ের কেনাকাটা ৪-৬ শতাংশ বেড়ে বাজার ২ হাজার ৩০০ কোটি ইউরোর সমপরিমাণে পৌঁছতে পারে।

গবেষণা অনুসারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার অভাবের কারণে গত দুই বছরে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো ছয়-সাত কোটি ক্রেতা হারিয়েছে। ফলে ক্রেতা ১৮ শতাংশ কমে ৩৩ কোটিতে নেমেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসপণ্য ব্র্যান্ডগুলোর জুতা ও হ্যান্ডব্যাগ বিভাগ। অথচ এ-জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ডি’আরপিজিওর কথায়, ‘ক্রেতাদের আলমারিতে একই ব্যাগের বহু সংস্করণ আগেই রয়েছে। অতএব নতুন করে কিনতে তাদের আগ্রহ কম।’

বিলাসপণ্যের জগতে ধনী ও অতিধনীদের ব্যবধানে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। ৩ কোটি ইউরোর বেশি মূল্যমানের সম্পদের মালিক অতিধনীর সংখ্যা চার লাখ। তাদের পরিবার মিলিয়ে মোট প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বাজারের সবচেয়ে স্থিতিশীল গ্রাহক। অন্যদিকে বাকি গ্রাহকরা নিজেকে উপেক্ষিত মনে করছে। কারণ ব্র্যান্ডগুলো মূলত এসব অতিধনী ক্রেতার ওপর দৃষ্টি দিচ্ছে।

বিলাসপণ্য ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। ডি’আরপিজিও বলেন, ‘দাম বাড়ানোর এ কৌশল খুবই বিপজ্জনক। কারণ এতে মূল্য ও মানের সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে।’

এখন ব্র্যান্ডগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন; কোন গ্রাহককে তারা সেবা দিতে চায়? একই সঙ্গে সামনে রয়েছে সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ। কয়েক দশক ধরে বিলাসবহুল পণ্যবাজারকে এগিয়ে নিয়েছে এ পদক্ষেপই।

আরও